ePaper

বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক নিয়ে যেসব উদ্বেগ তৈরি হতে পারে

বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক নিয়ে যেসব উদ্বেগ তৈরি হতে পারে
জাতীয় সারাবিশ্ব

১৯৭২ সালের অগাস্ট মাসে বাংলাদেশের সদস্যপদ নিয়ে যখন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভোট হয়, তখন ১৫টি দেশের মধ্যে একমাত্র চীন তাদের ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিল। পঞ্চাশ বছরের মধ্যে সেই চীনই এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য সহযোগী।

চীনের সাথে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানির পরিসংখ্যান অথবা দুই দেশের মধ্যে চলতে থাকা দ্বিপাক্ষীয় চুক্তির সংখ্যা দিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের ব্যপ্তিটা আসলে বোঝা যায় না। চীন আর বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্কে ব্যাবসায়িক মাত্রার পাশাপাশি রাজনৈতিক আর কৌশলগত অনুষঙ্গও যোগ হয়েছে গত কয়েক দশকে।

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সম্পর্কের উন্নয়নের পাশাপাশি যুগপৎভাবেই পশ্চিমের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কসহ কয়েকটি বিষয় নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশে অন্যান্য দেশের আগ্রহ

বাংলাদেশ সবসময়ই কোনো দেশের সাথে শত্রুতামূলক বা বৈরি সম্পর্কে না জড়িয়ে নিরপেক্ষ পররাষ্ট্র নীতি মেনে চলেছে।

উন্নয়নের সহযোগী দেশগুলোর – ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান – সাথে সবসময় বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রেখে চললেও সেসব দেশের সাথে কখনো কোনো জোটের অংশ ছিল না বাংলাদেশ।

এই ‘কোনো জোটে না থাকা’র বিষয়টি বাংলাদেশকে অন্যান্য দেশের সামনে নিরপেক্ষ একটা পরিচয় দিতে পেরেছে বলে মনে করেন চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদ।

“গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের প্রতি যুক্তরাষ্ট্র, ভারতের মত দেশের আগ্রহ বেশ জোরেসোরে প্রকাশিত হয়েছে। ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি নিয়ে অনেক জোর কথাবার্তা হয়েছে। সেসব কারণে এরকম একটা আলোচনা তৈরি হয়েছিল যে বাংলাদেশ পশ্চিমের দিকে কিছুটা ঝুঁকছে কিনা।”

“চীনও হয়তো আমাদের বন্ধু হিসেবে সেটা জানার চেষ্টা করছে। কিন্তু আমার মনে হয় বাংলাদেশ চীনকে আশ্বস্ত করবে যে বাংলাদেশ সবার সাথে বন্ধুত্ব রাখতে চায় এবং কোনো নির্দিষ্ট পক্ষ বা জোটের সাথে বন্ধুত্ব চায় না।”

মি. আহমেদ বলছিলেন, “আমরা চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত বা জাপান কাউকেই ছাড়তে পারবো না। কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের সাথে বন্ধুত্ব বা শত্রুতা রাখলে বাংলাদেশ যেরকম উন্নয়নের ধারায় রয়েছে, তা অব্যাহত রাখতে পারবে না।”

মুন্সী ফয়েজ আহমেদের মতে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের পাশাপাশি গত কয়েক দশকের অর্থনৈতিক উন্নয়নের কারণেও বাংলাদেশ বিশ্বের কাছে গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে।

তার ভাষায়, “অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে সাথে বাংলাদেশে মানুষের যেহেতু ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে, আগামী কয়েক বছরে আরো প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস রয়েছে – তাই অন্যান্য দেশও এই অর্থনৈতিক উন্নয়নের অংশীদার হতে আগ্রহী।”

পাশাপাশি সম্প্রতি ভারত ও মিয়ানমারের সাথে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধের নিষ্পত্তি হওয়ার পর আরো বিপুল পরিমাণ সম্পদ পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়ার বিষয়টিও একটি ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন মি. আহমেদ।

যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ

বাংলাদেশের ওপর চীনের প্রভাব বাড়তে থাকার বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের উদ্বেগ রয়েছে বলে বলা হয়ে থাকে।

উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশের সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর তৈরি করা নিয়ে হওয়া টানাপোড়েনের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১০ সালে চীনে গিয়ে সাহায্য চেয়েছিলেন কক্সবাজার উপকূলে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের জন্য। চীন বেশ আগ্রহের সঙ্গেই এই প্রস্তাবে সাড়া দিয়েছিল।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র আর ভারতের চাপে শেষ পর্যন্ত ঐ প্রকল্পটি থেকে পিছিয়ে এসে জাপানের সহায়তায় মাতারবাড়িতে গভীর সমুদ্র বন্দর তৈরির প্রকল্পে হাত দেয় বাংলাদেশ।

কিছুদিন আগে বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে কুয়ালালামপুরের মালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ মাহমুদ আলী বলছিলেন, “বাংলাদেশ এই সাহায্য পাচ্ছে বাংলাদেশের কারণে নয়, মূল কারণ হচ্ছে চীন যেন বাংলাদেশে ঢুকতে না পারে। চীন যেন বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহারের সুযোগ বা অনুমতি না পায়।”

তবে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাব এরকম নয় বলে ধারণা প্রকাশ করেন সাবেক কূটনীতিক ও যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির।

তিনি বলছিলেন, “বাংলাদেশের অনেক প্রয়োজন আছে যেগুলোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বা অনেক পশ্চিমা দেশ সহায়থা করতে পারে না। সেরকম ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যদি চীনের কাছ থেকে সহায়তা পায় তাহলে, তারা খুশি হবে না, কিন্তু আপত্তিও করবে না।”

এ ধরণের ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও যথাযথ যোগাযোগের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এক্ষেত্রে ইউক্রেনের সাথে যুদ্ধ চলাকালীন সময় রাশিয়া থেকে ভারতের তেল কেনার উদাহরণ দেন তিনি। বলেন, “ভারত রাশিয়া থেকে তেল কিনেছে, এস-৪০০ মিসাইল কিনেছে – তারা কিন্তু আমেরিকার সাথে বিষয়টা বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে রাশিয়া থেকে তেল না কিনলে তাদের পক্ষে তেল পাওয়াটা কঠিন। আমেরিকাও কিন্তু সেখানে ভারতের যুক্তি মেনে নিয়েছে।”

এ ধরণের বিষয়ে আমেরিকার সাথে আলোচনা ও দর কষাকষির জন্য বাংলাদেশের কূটনৈতিক পর্যায়ে আরো জোরালো পদক্ষেপ নেয়া উচিৎ বলে মনে করেন তিনি।

যেসব বিষয় নিয়ে চীনের সাথে দন্দ্ব তৈরি হতে পারে

চীনের সাথে বর্তমানে বাংলাদেশের কৌশলগত সম্পর্ক ভালো হলেও ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে কয়েকটি বিষয় নিয়ে সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।

জার্মানি ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা মেরকাটর ইনস্টিটিউট ফর চায়না স্টাডিজ চীনের সাথে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে একটি গবেষণা পত্র প্রকাশ করে ২০২২ সালের অগাস্টে। ঐ গবেষণা পত্রে বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্কের বিষয়ে একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো ড. আনু আনোয়ার।

ড. আনোয়ারের ধারণা অনুযায়ী, সম্ভাব্য তিনটি ইস্যুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে।

প্রথমত, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কে অবনতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে মিয়ানমার যেহেতু চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তাই চীন বাংলাদেশের আশা অনুযায়ী রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে হয়তো ভূমিকা রাখতে চাইবে না।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীনের এই অবস্থান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশে চীনের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে বাড়তে থাকা বাণিজ্য ঘাটতি বাংলাদেশের জন্য চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে।

দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ বোঝাতে ড. আনোয়ার ২০১৮ সালের পরিসংখ্যান তুলে ধরেন, যেখানে চীন থেকে প্রায় ১৮০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানির বিপরীতে বাংলাদেশের চীনে রপ্তানি করে প্রায় ১০০ কোটি ডলারের পণ্য।

আর তৃতীয় সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ব্রহ্মপুত্র নদের উপরের অংশে বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরির পরিকল্পনার উল্লেখ করেন ড. আনোয়ার।

হিমালয়ের পাদদেশে তিব্বতের স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চলে ৬০ গিগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি ‘সুপার হাইড্রোপাওয়ার’ বাধ তৈরির পরিকল্পনা চীনের রাষ্ট্রায়ত্ব গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় ২০২০ সালের নভেম্বরে। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় থাকা বাংলাদেশের এলাকাগুলোর পাশাপাশি অরুনাচল প্রদেশ ও আসামের অনেক এলাকার জীববৈচিত্র ও মানুষের জীবিকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে।