ePaper

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আমাদের কতটা ভয় পাওয়া উচিৎ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আমাদের কতটা ভয় পাওয়া উচিৎ
বিচিত্র বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

২০১৯ সালে ওপেনএআই নামের একটি গবেষণা দল এমন একটি সফটওয়্যার তৈরি করেছিল, যেটি কয়েক মাত্র প্যারাগ্রাফের একটি অর্থবহ টেক্সট লিখতে পারতো। এছাড়া এই সফটওয়্যার সুনির্দিষ্ট নির্দেশ ছাড়া কোন কিছু পড়ে মোটামুটি তা বুঝতে পারতো, কিছুটা বিশ্লেষণ করতে পারতো।

ওপেনএআই শুরুতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তাদের তৈরি এই সফটওয়্যার, যেটির নাম তারা দিয়েছিল জিপিটি-টু, সবার ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করবে না। তাদের আশংকা ছিল, লোকে এটি ব্যবহার করে খারাপ উদ্দেশ্য ব্যাপক হারে অপপ্রচার এবং মিথ্যাচার চালাবে। তখন এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে ওপেনএআই এর গবেষক দল বলেছিল, “এটি খুব বেশি বিপদজনক।”

এরপর ফাস্ট ফরোয়ার্ড করে তিন বছর সামনে আসা যাক। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সক্ষমতা বহুগুণ বেড়েছে।

ওপেনএআই এর জিপিটি-টু সীমিত কিছু ব্যবহারকারীর মধ্যে ছাড়া হয়েছিল। কিন্তু গত নভেম্বরে যখন তারা জিপিটি-থ্রী বাজারে ছাড়লো, সেটি তাৎক্ষণিক-ভাবে সবার ব্যবহারের জন্যই উন্মুক্ত করে দেয়া হয়।

সাংবাদিকরা এবং বিশেষজ্ঞরা যখন এই প্রোগ্রামিং এর চ্যাটবট-জিপিটির সক্ষমতা পরীক্ষা করে দেখছিলেন, তখন তাদের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। চ্যাটবট-জিপিটি ব্যবহার করে হাজার হাজার সংবাদ প্রতিবেদন এবং সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট লেখা হয়েছে।

প্রয়াত কমেডিয়ান জর্জ কার্লিনের স্টাইলে এটিকে দিয়ে স্ট্যান্ড-আপ কমেডি লেখানো হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের দেউলিয়া হয়ে যাওয়া সিলিকন ভ্যালি ব্যাংক নিয়ে। এটি খ্রিস্টধর্ম তত্ত্ব সম্পর্কে মতামত দিয়েছে। কবিতা লিখেছে। পদার্থবিদ্যার কোয়ান্টাম থিউরি বুঝিয়ে দিয়েছে শিশুকে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের অন্যান্য মডেল, যেমন ডাল-ই এমন নিখুঁত ছবি তৈরি করেছে যে, এগুলো আর্ট ওয়েবসাইটে দেয়া উচিৎ কিনা তা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।

মেশিনও এখন সৃষ্টিশীল হয়ে উঠেছে, অন্তত খালি চোখে তাই মনে হবে।

ওপেনএআই গত মার্চ মাসে যখন তাদের সর্বশেষ সংস্করণ জিপিটি-ফোর চালু করে, তখন তারা বলেছিল, অপব্যবহার বন্ধের জন্য এটির ভেতরে নানা ব্যবস্থা করা আছে। প্রথম যারা এর গ্রাহক হয়েছে তাদের মধ্যে আছে মাইক্রোসফট, মার্কিন ব্যাংক মেরিল লিঞ্চ এবং আইসল্যান্ডের সরকার।

মার্চ মাসেই যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের অস্টিনে এক সম্মেলনে জড়ো হয়েছিলেন সারা বিশ্বের প্রযুক্তি খাতের নীতি-নির্ধারক, বিনিয়োগকারী এবং নির্বাহীরা। সেখানে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সম্ভাবনা এবং ক্ষমতা।

আরতি প্রভাকর হোয়াইট হাউসের বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি নীতি বিষয়ক দফতরের পরিচালক। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সম্ভাবনা নিয়ে তিনি দারুণ উৎসাহী। তবে এ নিয়ে তিনি একটা হুঁশিয়ারিও দিচ্ছেন।

“আমরা যা দেখছি, তা হলো অসম্ভব শক্তিশালী এক প্রযুক্তির আবির্ভাব। এটি সংক্রমণের পর্যায় মাত্র। ইতিহাসে সব সময় দেখা গেছে, এ ধরণের শক্তিশালী নতুন প্রযুক্তি ভালো এবং মন্দ – উভয় কাজেই ব্যবহৃত হয়”- সম্মেলনে একটি প্যানেলে আলোচনায় অংশ নেয়ার সময় বলছিলেন তিনি।

তার প্যানেলের আরেকজন আলোচক অস্টিন কার্লসন হুঁশিয়ারিটা দিলেন একদম রাখ-ঢাক না রেখে।

“আগামী ছয় মাসের মধ্যে আপনি যদি আপনি হতবাক হয়ে না যান, আমি আপনাকে ডিনার খাওয়াবো”, বলছিলেন সীডএআই নামে একটি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নীতি বিষয়ক উপদেষ্টা গ্রুপের এই প্রতিষ্ঠাতা।

অ্যামি ওয়েব হচ্ছেন ফিউচার টুডে ইন্সটিটিউটের প্রধান এবং নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক। এই সম্মেলনে তিনি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সম্ভাব্য ফল কী দাঁড়াবে, তার একটা চিত্র দেয়ার চেষ্টা করলেন। তার মতে, আগামী দশ বছরে এটি দুই বিপরীত দিকে যেতে পারে।

তিনি প্রথমে এমন একটি আশাবাদী দৃশ্যপটের কথা বলছে, যেখানে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সমস্ত উন্নতি ঘটানো হবে সর্বসাধারণের কল্যাণে। এআই সিস্টেমগুলোর ডিজাইনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে। সেখানে একজন ব্যক্তি চাইলে তার প্রকাশ্য তথ্য এআই’র জ্ঞানের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করতে দেয়া হবে কিনা, সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। এখানে প্রযুক্তি ব্যবহৃত হবে মানুষের জীবন সহজ এবং বাধাহীন করার কাজে। ভোক্তাদের ঠিক কি ধরণের পণ্য দরকার, এআই তা আঁচ করতে পারবে এবং যে কোন কাজ সম্পাদনেই সাহায্য করতে পারবে।

অন্যদিকে অ্যামি ওয়েব এআই নিয়ে বিপর্যয়কর যে দৃশ্য-কল্প অনুমান করছেন, সেখানে ডেটা নিয়ে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সুরক্ষা থাকবে কম, অল্প কটি কোম্পানির হাতে অনেক বেশি ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হবে, এবং এআই মানুষের চাহিদা আগে থেকেই অনুমান করবে। তবে এর ফলে তাদের অনেক সময় ভুল হবে, অথবা মানুষের পছন্দকে তারা অনেক বেশি সংকুচিত করে ফেলবে।

অ্যামি ওয়েবের মতে, তিনি যে সম্ভাব্য আশাবাদী দৃশ্যপটের কথা বলছেন, সেরকম ঘটার সম্ভাবনা মাত্র ২০ শতাংশ।

বিবিসিকে অ্যামি ওয়েব বলেন, “এই প্রযুক্তি আসলে কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করবে কোম্পানিগুলো এই প্রযুক্তি তৈরিতে কতটা দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়, তার ওপর। তারা কি এটি স্বচ্ছতার সঙ্গে করছে? যে তথ্যভাণ্ডার থেকে চ্যাটবটগুলো তথ্য সংগ্রহ করছে, সেগুলোর সূত্র কী তারা প্রকাশ করছে? এগুলো কি তারা ঠিকমত তদারকি করছে?”

তিনি বলেন, এক্ষেত্রে অন্য বিবেচনাটি হচ্ছে, এ ধরণের প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ এবং অপব্যবহার বন্ধে আইনি সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে সরকার- ফেডারেল নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং কংগ্রেস- যথেষ্ট দ্রুততার সঙ্গে আগাতে পারবে কিনা।

এক্ষেত্রে অতীতে ফেসবুক, টুইটার, গুগল বা এধরণের সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোর বেলায় সরকারের যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল, সেটা একটা উদাহরণ হতে পারে। সেই অভিজ্ঞতা খুব উৎসাহব্যঞ্জক ছিল না।

“অনেক আলোচনাতেই যে বিষয়টা আমি বেশি শুনেছি, তা হলো এ ধরণের যথেষ্ট আইনি সুরক্ষা ছিল না বলে উদ্বেগ,” বলছেন মেলানি সুবিন। তিনি ফিউচার টুডে ইন্সটিটিউটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

তিনি সাউ বাই সাউথ-ওয়েস্টের সম্মেলনে তার অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করছিলেন।

“কিছু একটা যে করতে হবে, এরকম একটা বোধ তৈরি হয়েছে। আমার মনে হয় সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে অশনি সংকেতের সেই কাহিনী মানুষের মনে আছে। লোকে যখন দেখে এআই’র কত দ্রুত উন্নতি ঘটছে, তখন লোকে সে কথাই স্মরণ করে।”

সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোর ওপর ফেডারেল নজরদারি মূলত ১৯৯৬ সালে কংগ্রেসের পাশ করা কম্যুনিকেশন ডিসেন্সী এ্যাক্ট দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। এর সঙ্গে আছে আইনের ২৩০ ধারায় যুক্ত একটি সংক্ষিপ্ত এবং শক্তিশালী ধারা। এই আইনের ধারায় ইন্টারনেট কোম্পানিগুলোকে ব্যবহারকারীদের তৈরি করা কনটেন্টের জন্য তাদের ওপর দায় চাপানোর ব্যাপারটা থেকে রেহাই দেয়া হয়েছে। এই আইনের বলে নাকি এমন একটা পরিবেশ তৈরি সম্ভব হয়েছে, যাতে করে সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলো ভালো ব্যবসা করতে পারে। কিন্তু অতি সম্প্রতি আবার এই আইনকেই দোষারোপ করা হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোর এতে বেশি ক্ষমতাশালী এবং প্রভাবশালী হয়ে ওঠার জন্য।

ডানপন্থী রাজনীতিকরা অভিযোগ করেন যে, এরফলে গুগল বা ফেসবুকের মত প্রতিষ্ঠান রক্ষণশীল মতাদর্শকে সেভাবে সামনে না আনার ক্ষমতা পেয়েছে। অন্যদিকে বামপন্থীদের অভিযোগ, এসব কোম্পানি ঘৃণা এবং সহিংসতার হুমকি রোধে যথেষ্ট করছে না।

মিশিগানের সেক্রেটারি অব স্টেট জোসেলিন বেনসন বলেন, “ঘৃণ্য বাদানুবাদ যে ঘৃণ্য কাজে মদত দেয়, সেটা স্বীকার করা, এবং সেটার দায়িত্ব নেয়ার সুযোগ আমাদের আছে।” ২০২০ সালে ডিসেম্বরে তার বাড়িকে টার্গেট করেছিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের সশস্ত্র সমর্থকরা। এই বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়েছিল ফেসবুকে। তারা ২০২০ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফল চ্যালেঞ্জ করছিল।

মিশিগানে একটি প্রস্তাবিত আইনে তিনি সমর্থন দিয়েছেন, যেটিতে জেনেশুনে ক্ষতিকর তথ্য প্রচারের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিকে দায়ী করা যাবে। ফেডারেল পর্যায়ে এবং অন্যান্য রাজ্যে একই ধরণের আইনের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। অপ্রাপ্ত বয়স্কের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলো যেন আরও সুরক্ষার ব্যবস্থা করে, সেটাও বলা হয়েছে। কনটেন্ট মডারেশন নীতির ব্যাপারে তারা যেন আরও খোলামেলা হয় এবং অনলাইনে হয়রানি বন্ধে যেন আরও সক্রিয় হয়, সেই দাবিও উঠছে।

কিন্তু এধরণের সংস্কারের প্রস্তাব সফল হওয়ার সম্ভাবনা কতটা, তা নিয়ে মতামত মিশ্র। বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওয়াশিংটন ডিসি-তে বড় বড় লবি গ্রুপ আছে, তারা কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকার এবং নীতি-নির্ধারকদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে। তাদের পকেটে অর্থও অঢেল। রাজনীতিকদের নির্বাচনী প্রচারণায় চাঁদার যোগান দিয়ে তাদের ওপরেও প্রভাব বিস্তার করতে পারে।

“ফেসবুকে এবং অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়ায় বহু ধরণের সমস্যার প্রমাণ থাকার পরও কিন্তু ২৫ বছর পেরিয়ে গেছে। আমরা কিন্তু এখনও ভোক্তাদের স্বার্থ সুরক্ষার জন্য কংগ্রেসের দিক থেকে এখনো কোন ধরণের আইনের প্রতীক্ষায় আছি, কিন্তু তারা তাদের দায়িত্ব মোটেই পালন করেনি,” বলছেন প্রযুক্তি বিষয়ক সাংবাদিক কারা সুইশার।

তিনি বলছেন, এখানে বিপদটা হচ্ছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় যারা সবচেয়ে বড় বড় কোম্পানি- যেমন ফেসবুক, গুগল, আমাজন, অ্যাপল এবং মাইক্রোসফট- তারাই এখন আবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে। কাজেই কংগ্রেস যেখানে সোশ্যাল মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি, সেখানে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের জন্য এখন ‘অস্ত্র প্রতিযোগিতার’ মতো যেরকম দৌড় শুরু হয়েছে, সেটি নিয়ে কতটা কী তারা করতে পারবে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং সোশ্যাল মিডিয়ার এই তুলনা কেবল তাত্ত্বিক নয়। নতুন যে এআই প্রযুক্তি তৈরি হচ্ছে, সেগুলো কিন্তু ফেসবুক, ইউটিউব বা টুইটারের মতো সাইটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে। এরপর এগুলোকে টগবগ করে ফুটতে থাকা ভুল তথ্য আর মিথ্যাচারের এক সমুদ্রে পরিণত করতে পারে। কারণ সত্যিকারের মানুষ থেকে ভুয়া মানুষের পোস্ট আলাদা করা তখন আরও বেশি কঠিন হয়ে পড়বে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স দিয়ে পরিচালিত ভুয়া একাউন্টগুলো তখন এমনভাবে পরিচালিত হবে যে তাদের বিশ্বাস না করার কোন কারণ থাকবে না।

সরকার যদি সোশ্যাল মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণের জন্য নতুন নীতি তৈরিতে সফলও হয়, ততদিনে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ভুয়া তথ্যের বন্যায় ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে যাবে। এসব নতুন রেগুলেশন তখন অর্থহীন হয়ে পড়বে।