ePaper

পাকস্থলী-পিত্তথলির ক্যান্সার বেশি তরুণী ও মধ্যবয়সী নারীদের

পাকস্থলী-পিত্তথলির ক্যান্সার বেশি তরুণী ও মধ্যবয়সী নারীদের
লাইফস্টাইল

দেশের মানুষের মৃত্যুর দ্বিতীয় কারণ ক্যান্সার। বছরে এক লাখেরও বেশি মানুষ এ রোগে মারা যায়। দেহের স্থানভেদে কর্কট রোগ হয় বিভিন্ন প্রকার। আবার এক ক্যান্সারেরই রয়েছে অনেক ধরন। এর মধ্যে তরুণী এবং মধ্যবয়সী নারী ও পুরুষের মাঝে পাকস্থলী ও পিত্তথলির ক্যান্সারে আক্রান্তের হার প্রতিনিয়তই বাড়ছে। বিশেষ করে এ বয়সী নারীর মধ্যে এর আক্রান্ত ও মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি। অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে খাদ্যাভ্যাস ও জীবনাচারের পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদি এ রোগ বাড়াচ্ছে বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সার (আইএআরসি) গত মার্চে ‘হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস অ্যান্ড রিলেটেড ডিজিজেস রিপোর্ট’ শিরোনামে এক গবেষণাপত্র প্রকাশ করে। তাতে বাংলাদেশের সব বয়সী নারী-পুরুষের ৩৩টি ক্যান্সারের বিভাজন দেখিয়েছে সংস্থাটি। এর মধ্যে ১৫-৪৪ বছর বয়সী নারীর মধ্যে পাকস্থলী ও পিত্তথলির ক্যান্সারে আক্রান্তের হার বেশি। এ রোগে তাদের মৃত্যুও বেশি হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে। 

আইএআরসি বলছে, ১৫-৪৪ বছর বয়সী প্রতি এক লাখ নারীর মধ্যে ২ দশমিক ৬৭ জন পিত্তথলির ক্যান্সারে ভোগে, যেখানে পুরুষের আক্রান্তের হার শূন্য দশমিক ৪৭। একইভাবে প্রতি লাখে মৃত্যু হচ্ছে ২ দশমিক শূন্য ৮ নারীর ও শূন্য দশমিক ৩৭ পুরুষের। পাকস্থলীর ক্যান্সারেও এ বয়সী নারীর আক্রান্তের হার পুরুষের চেয়ে বেশি। প্রতি লাখে ১ দশমিক ৩৭ পুরুষ এ রোগে ভুগলেও নারী আক্রান্ত হচ্ছে ১ দশমিক ৫৭ জন। একইভাবে প্রতি লাখে শূন্য দশমিক ৮৩ জন পুরুষের বিপরীতে মৃত্যু হচ্ছে ১ দশমিক ১৩ নারীর। 

যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস) বলছে, পাকস্থলীর যেকোনো অংশে ক্যান্সার পাওয়া যেতে পারে। তবে এটি কতটা গুরুতর তা নির্ভর করে রোগটি ছড়িয়ে পড়েছে কিনা তার ওপর। পিত্তথলির ক্যান্সারও খাদ্যের পরিপাকে বিশেষ ভূমিকা রাখা এ অঙ্গের যেকোনো অংশে পাওয়া যেতে পারে। 

জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের (এনআইসিআরএইচ) ক্যান্সার রোগতত্ত্বের সাবেক অধ্যাপক ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পাকস্থলীর ক্যান্সার হওয়ার পেছনে বেশকিছু কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, খাওয়াদাওয়ার ব্যাপার আছে। খুব স্পাইসি খাবারের সঙ্গে সম্পর্ক আছে। অ্যাসিডিটির সঙ্গে সম্পর্ক আছে। হেলিকোব্যাক্টর পাইলোরি বা এইচ পাইলোরি ব্যাকটেরিয়ায় সৃষ্ট সংক্রমণের কারণে পাকস্থলীর ক্যান্সার হতে পারে। তারপর অ্যালকোহলের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। অনেক সময় গলব্লাডারে স্টোন (পিত্তথলিতে পাথর) হয়, সেটা থেকেও সংক্রমণ হয়। নারীদের ক্যান্সারের সঙ্গে জীবনাচার ও খাদ্যাভ্যাসের সম্পর্ক রয়েছে।’

সব বয়সী নারী ও পুরুষের মধ্যে ক্যান্সার বিভাজনের ক্ষেত্রে আইএআরসি বলেছে, নারীর মধ্যে স্তন ক্যান্সার সবচেয়ে বেশি। প্রতি লাখে ১৬ জন এ ক্যান্সারে আক্রান্ত। এর পরে রয়েছে জরায়ুমুখের ক্যান্সার। এতে প্রতি লাখে আক্রান্তের সংখ্যা ১০ জনেরও বেশি। খাদ্যনালীর ক্যান্সারে ৯ দশমিক ৩৪, পিত্তথলির ক্যান্সারে ৬ দশমিক ৫৫ এবং ঠোঁট ও মুখগহ্বরের ক্যান্সারে প্রতি লাখে ৫ দশমিক ৬৮ জন আক্রান্ত হচ্ছে। অন্যদিকে পুরুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্যান্সার হচ্ছে খাদ্যনালীর, প্রতি লাখে ১৭ জন। এরপর ফুসফুসের ক্যান্সার দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। এতে আক্রান্ত হচ্ছে ১১ দশমিক ৮ জন। তৃতীয় অবস্থানে ঠোঁট ও মুখগহ্বরের ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে ১১ জন পুরুষ। 

বাসি খাবার গ্রহণ পাকস্থলী ক্যান্সারের গুরুত্বপূর্ণ কারণ জানিয়ে এনআইসিআরএইচের ক্যান্সার ডায়াগনস্টিকের সাবেক অধ্যাপক ডা. গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘শুঁটকি ও অতিরিক্ত লবণ পাকস্থলীর ক্যান্সারের অন্যতম কারণ। পিত্তথলিতে পাথর হলে সেখান থেকে ক্যান্সার হয়। এছাড়া খাদ্যে ভেজালেও এ ক্যান্সারগুলো হতে পারে। ঝাল, লবণ ও সংক্রমণের কারণে এসব ক্যান্সার প্রভাবিত হতে পারে। স্বাভাবিকভাবেই মেয়েদের ক্ষেত্রে গলব্লাডারে ক্যান্সার বেশি হয়।’

বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়ে কোনো ক্যান্সার রেজিস্ট্রি নেই। বছরে সারা দেশে কত রোগী এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে বা মারা গেছে এমন হিসাব সরকারের কাছে নেই। তবে গ্লোবাল ক্যান্সার ইনসিডেন্স, মর্টালিটি অ্যান্ড প্রিভিলেন্স (গ্লোবোক্যান) পরিসংখ্যানের আলোকে আইএআরসি একটি হিসাব করেছে। তারা জানিয়েছে, বাংলাদেশে গত পাঁচ বছরে শনাক্তকৃত রোগীর মধ্যে এখনো ক্যান্সারে আক্রান্ত রয়েছে ২ লাখ ৭১ হাজারের কাছাকাছি। এর মধ্যে ২০২০ সালে শনাক্ত হয়েছিল ১ লাখ ৫৬ হাজার ৭৭৫ জন। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার ক্যান্সার রোগীর।

বিশেষজ্ঞরা যদিও বলছেন, দেশে বছরে তিন-চার লাখের মতো মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। মারা যাচ্ছে দেড় লাখ। কোথাও এ হিসাব তালিকাভুক্ত হচ্ছে না। প্রাক্কলিত রোগীর সংখ্যার চেয়ে কয়েক গুণ ক্যান্সার রোগী বছরে রোগ শনাক্তের বাইরে থেকে যায়। দেশে বিশেষায়িত পর্যায়ের (টারশিয়ারি) সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ক্যান্সারের চিকিৎসার কমবেশি সুবিধা রয়েছে। তবে সরকারিভাবে একমাত্র বিশেষায়িত হাসপাতাল এনআইসিআরএইচ। সারা দেশের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার রোগীরাই চিকিৎসার জন্য দেশের সর্বোচ্চ এ হাসপাতালে আসে। তাদের তথ্যে তৈরি রেজিস্ট্রি দেশের ক্যান্সার রোগীর হিসাবের প্রতিনিধিত্ব করে। 

হাসপাতালটির ক্যান্সার রোগতত্ত্ব (ক্যান্সার এপিডেমিওলজি) বিভাগ সম্প্রতি ‘ক্যান্সার রেজিস্ট্রি রিপোর্ট: ২০১৮-২০’ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালটিতে ৮৩ হাজারের কিছু বেশি রোগী চিকিৎসার জন্য বহির্বিভাগে এসেছিল। এর মধ্যে সাড়ে ৩৫ হাজারের ক্যান্সার শনাক্ত হয়েছে। দেশে সাধারণভাবে পুরুষের চেয়ে নারী ক্যান্সার রোগীদের হার বেশি। এ তিন বছরেও হাসপাতালটিতে ক্যান্সার শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে নারীর হার ছিল ৫৫ শতাংশ।

শিক্ষাবিদ ও চিকিৎসাবিজ্ঞানী অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রত্যেকটা ক্যান্সারের জেনেটিক (বংশগতি) প্রবণতা থাকে, সেই প্রবণতা জাতিতে জাতিতে বিভিন্ন রকম হয়। জেনেটিক কারণে বিভিন্ন জাতি এবং এমনকি এক জাতির বিভিন্ন ব্যক্তি বা বংশের মধ্যেও অনেক সময় জেন্ডারের প্রবণতা ভিন্ন হয়। এখন জেন্ডারের প্রবণতা থেকে জিনের যে প্রবণতা অনেক যুগ থেকে, অনেক জেনারেশন থেকেই হয় তো ছিল। রোগটা বীজের মতো। জিনটা বীজের মতো। বীজকে যেমন মাটি-পানি না দিলে সেটি গাছে পরিণত হবে না, তেমনি ক্যান্সারও পরিবেশের কারণে প্রভাবিত হয়। কোনো একটি জেনেটিক কারণ থাকে, তার সঙ্গে প্রবণতাটা বাড়ে। পরিবেশে কৃত্রিম খাবার, রঙ অর্থাৎ জীবনে কৃত্রিমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃত্রিম উপাদানও বেড়েছে। এটাও ক্যান্সারের জীবাণুকে প্রভাবিত করে। এর প্রবণতাও বেড়ে গেছে।’

মানুষের ওজন আধিক্যের সঙ্গে ক্যান্সারের সুস্পষ্ট সম্পর্ক রয়েছে জানিয়ে ডা. লিয়াকত আলী আরো বলেন, ‘আমাদের জীবনাচার, কায়িক শ্রম কমে যাওয়ার কারণে ওজন আধিক্য সৃষ্টি হচ্ছে। জীবনাচারের পরিবর্তন ও দূষণের সঙ্গে যে কৃত্রিম উপাদানগুলো বেড়ে গেছে তাতে বহুগুণেই ক্যান্সারসহ দীর্ঘমেয়াদি জটিল রোগ বাড়ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা পুরুষের মধ্যে বেশি আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে নারীর মধ্যে বেশি।’ 

জাতীয়ভাবে ক্যান্সারের কোনো রেজিস্ট্রি না থাকায় সারা দেশের চিত্র মূলত কেমন তা বলা যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইন ডিরেক্টর (অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমরা গত বছর শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও হাসপাতাল, আহসানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতাল এবং একটি বেসরকারি হাসপাতালে আসা রোগীদের তথ্য দিয়ে ক্যান্সার রেজিস্ট্রি তৈরির একটি পাইলট প্রজেক্ট করার চেষ্টা চালিয়েছি। সেখানে বিভিন্ন ক্যান্সার রোগী পেয়েছি। তবে তা কোনোটাই জাতীয় অবস্থার প্রতিনিধিত্ব করে না। আইএআরসি যে তথ্য দিয়েছে তা প্রাক্কলিত। এটা দিয়েও জাতীয় অবস্থা বোঝা যাবে না। জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতাল থেকে যে তথ্য পাওয়া যায় তাও তাদের রোগীদের। সমগ্র বাংলাদেশের তথ্য সেখানে নেই। আমরা পরিকল্পনা করেছি, জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ বড় পাঁচটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে আমরা রোগীদের তথ্য নিয়ে কাজ করব। এতে কিছুটা ভালো তথ্য পাওয়া যাবে। এছাড়া ক্যান্সারসহ সব অসংক্রামক রোগকে গুরুত্ব দিয়ে সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।’