ePaper

'সেরা ব্যাটার' হিসেবে শুরু করা মমিনুল ১০ বছরেও কেন টেস্ট দলে নিয়মিত নন?

'সেরা ব্যাটার' হিসেবে শুরু করা মমিনুল ১০ বছরেও কেন টেস্ট দলে নিয়মিত নন?
খেলাধূলা

মমিনুল হক বাংলাদেশের অন্যতম সেরা ব্যাটার হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন ক্যারিয়ারের শুরুতেই, কিন্তু ১০ বছর পেরিয়েও মমিনুলের জায়গা জাতীয় দলে নিশ্চিত নয়।

কারণ হিসেবে তার ব্যাটিং ভিত্তিতে কিছু মৌলিক পরিবর্তন আনাকে দায়ী করছেন, বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিকেএসপির ক্রিকেট প্রধান নাজমুল আবেদীন ফাহিম।

তার মতে, ২০১৫ সালে ওয়ানডে বিশ্বকাপে ব্যর্থতার পর মমিনুল ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের সাথে মানিয়ে নিতে ব্যাটিং নিয়ে কিছু কাজ করেছিলেন, যা আসলে যথেষ্ট কাজে দেয়নি তার ব্যাটিং উন্নয়নে।

২০১৩ সালে মমিনুল যখন বাংলাদেশের ক্রিকেটে আসেন, তখন তাকে স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের সাথে তুলনা দেয়া হয়েছিল পত্রপত্রিকায়; এর কারণ সে বছর মমিনুলের ব্যাটিং গড় ছিল ৮৩।

সে সময় মমিনুল হক টানা ১১টি টেস্ট ম্যাচে অন্তত এক ইনিংসে ৫০ এর বেশি রান করেছিলেন, এই রেকর্ডে মমিনুল হক ওয়েস্ট ইন্ডিজের ভিভ রিচার্ডস, ভারতের গৌতম গম্ভীর ও ভিরেন্দার সেহওয়াগের পাশে নাম লিখিয়েছিলেন, সবচেয়ে বেশি ছিল এবি ডি ভিলিয়ার্স ও জো রুটের টানা ১২ টেস্ট ম্যাচে অন্তত এক ইনিংসে ৫০।

মমিনুল হকের গড় ২০১৪ সালেও ছিল ৫০ এর ওপর।

তবে ২০১৫ সাল থেকে শুরু হয় মমিনুল হকের পারফরম্যান্সের ক্রমশ পতন। ২০১৫, ২০১৬ এবং ২০১৭ সালে কোনও সেঞ্চুরি করতে পারেননি মমিনুল হক।

বাংলাদেশের শীর্ষ ক্রিকেটারদের মেন্টর নাজমুল আবেদীন ফাহিমের মতে, এই সময়টায় মমিনুল নিজের আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলেন।

২০১৭ সালে মমিনুল হক জাতীয় দল থেকে প্রথমবারের মতো বাদ পড়েন, সেই সময় বাংলাদেশ দলের কোচ ছিলেন বর্তমানে কোচের দায়িত্বে থাকা চান্ডিকা হাথুরুসিংহে।

তাই বর্তমান সময়টা মমিনুলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলছেন মি. ফাহিম।

মমিনুল সম্প্রতি আফগানিস্তানের বিপক্ষে একটি শতক হাঁকিয়েছেন, এই শতকটি মমিনুলের জন্য স্বস্তির, কারণ তিনি হাথুরুসিংহের অধীনে এটা করেছেন, দ্বিতীয়ত ২০২১ সালের পর এটাই মমিনুলের প্রথম টেস্ট শতক।

যদিও তিনিই বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি টেস্ট সেঞ্চুরির মালিক - ১২টি।

কিন্তু ২০২২ সালে মমিনুলের পরিসংখ্যান এতোটাই দুর্বল ছিল যে, তার নামের পাশে সেঞ্চুরির সংখ্যা তখন আলোচনাতেই আসেনি।

বাংলাদেশের হয়ে টেস্ট ক্রিকেটে অধিনায়কত্ব করা মমিনুল হক ২০২২ সালে এমন একটা সময় কাটিয়েছিলেন যেখান থেকে তার জাতীয় দলে ফেরাই কঠিন মনে হচ্ছিল একটা পর্যায়ে, সেখান থেকে মমিনুল হক ফিরেছেন ছয় ইনিংসে একটি ফিফটি ও একটি শতক দিয়ে।

বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে এখন মমিনুল হকের ১০ বছর চলছে।

এই দশ বছরে উত্থান ও পতনের ভেতর দিয়ে গেছে তার ক্যারিয়ার।

তবে সবচেয়ে বেশি নাটকীয় ছিল মমিনুলের ২০২২ সাল, এই সময়টায় তিনি রান পাননি একেবারেই, টানা ১১ ইনিংস মমিনুল হকের ব্যাটে এসেছে কেবলই এক অঙ্কের রান।

সেই চাপ কিছুটা লাঘব হয়েছিল ভারতের বিপক্ষে মমিনুল হকের ৮৪ রানের একটি ইনিংসে।

গত বছরের ডিসেম্বর মাসে মমিনুল হক জাতীয় দলে নিজের জায়গাটা ধরে রাখতে পেরেছেন এই এক ইনিংস দিয়েই।

২০২২ সালের শুরুটা তিনি করেছিলেন নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৮৮ রানের একটি ইনিংস দিয়ে, শেষ করেছেন ভারতের বিপক্ষে ঢাকা টেস্টে ৮৪ ও ৫ করে।

এর মাঝে মমিনুলের ওপর চাপ ছিল অধিনায়কত্বের, এরপর নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, বাংলাদেশ ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে টানা ব্যর্থ হয়েছেন ব্যাট হাতে, এই সময় মমিনুল হক মাত্র ১৩ গড়ে রান তুলেছিলেন।

আফগানিস্তানের বিপক্ষে সাম্প্রতিক শতক তাই মমিনুলের জন্য একটা বাড়তি প্রেরণার উৎস, মমিনুল মনে করেন, তিনি চেষ্টা করেছেন নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী খেলার।

শতক হাঁকানোর পর গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বলেন, "আমি খুব বেশি পরিবর্তন আনার চেষ্টা করিনি, আমি যেভাবে টেস্ট খেলি সেভাবেই করার চেষ্টা করেছি, আমার শক্তি যেখানে, সেখানেই জোর দিয়েছি"।

তিনি বলেন, অধিনায়কত্ব না থাকলে একটা সুবিধা থাকে 'এতো এতো চিন্তা করতে হয় না'।

মমিনুল হক মনে করেন, "টেস্টে একটা সুবিধা থাকে যে সীমাবদ্ধতা থাকলেও সেগুলো নিয়ে কাজ করা যায়"।

আফগানিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের রেকর্ড ব্যবধানে জয়ের ম্যাচে নাজমুল হোসেন শান্ত দুই ইনিংসেই সেঞ্চুরি করেছেন, এর আগে এই রেকর্ড ছিল মমিনুলের। মমিনুল বলেন, "শান্ত বা লিটন যে ধরনের ব্যাটার দেখতে খুব সুন্দর লাগে। শান্ত খারাপ বল ছাড়ে না।"

শান্ত ও লিটন দাসের সাথে নিজের তুলনা দিয়ে মমিনুল হক বলেন, আমার ধরনটা ভিন্ন, আমি চাইলেও এভাবে ব্যাট করতে পারবো না।

নাজমুল আবেদীন ফাহিম ব্যাটার মুমিনুল হককে নিয়ে নিজের বিশ্লেষণে বলেন, " প্রত্যেকের আলাদা ক্ষমতা ও দক্ষতা রয়েছে। মমিনুলেরও তাই। কিন্তু সে টেস্ট যখন শুরু করলো, ওয়ানডেতে সেই খেলা যথেষ্ট না, কিছু পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছে, ফাউন্ডেশনে বদল এসেছে। এটা তাকে তেমন সুবিধা দেয়নি।"

মমিনুলের ১০ বছরের টেস্ট ক্যারিয়ারের আরেকটা হাইলাইটস হলো ঘরে ও বাইরে টেস্ট পারফরম্যান্সের ফারাক।

বাংলাদেশের মাটিতে মমিনুল হক

টেস্ট- ৩২

রান- ২৫৯৯

গড়- ৫০

বাংলাদেশের বাইরে মমিনুল হক

টেস্ট- ২৫

রান- ১১৯২

গড়- ২৬।

২০১৯ সালে জুয়াড়ির সাথে কথোপকথন গোপন করার দায়ে সাকিব আল হাসানের শাস্তির কারণে মমিনুল হককে টেস্ট ক্রিকেটের অধিনায়কত্ব দেয়া হয়েছিল।